মুখবন্ধ


     ভূরাজনীতিকে কেন্দ্রে রেখে আমার প্রারম্ভিক ব্লগের প্রাক্কালে পাঠকবন্ধুদের কাছে আমার নিবেদন, এই ব্লগেরগুলির মাধ্যমে যে বিষয়বস্তু আপনাদের কাছে রাখব তা কোন পণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার প্রতিফলন নয়, এটাকে বরং বিশ্বজুড়ে ভূরাজনীতির জগতে সতত যে জটিল আবর্তের সাক্ষাৎ পাচ্ছি, সেটা আপনাদের মত এক উৎসাহী অনুসারী হিসাবে সেই ঘটনাগুলির পরিপ্রেক্ষিত ও সম্ভাব্য কার্যকারণ বোঝার প্রয়াসের অংশ হিসাবে কিছু কথা আপনাদের সামনে রাখব ।

     বলা বাহুল্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি নিয়ত যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর প্রত্যেকটাকে নজরে রাখার সামর্থ্য আমার নেই ও তার প্রয়োজনীতাও নেই; কারণ এগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনা সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেয়, কিছু ঘটনা, কেবল কিছু দেশের স্বার্থের সাথে জড়িত থাকে, আবার কিছু রাজনৈতিক ঘটনা এক বা সামান্য কিছু রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ সেগুলোর রেশ জাতীয় সীমানার বাইরে ছড়িয়ে যায় না। আমি প্রথমোক্ত শ্রেণীর ঘটনাসমূহের দিকে আমার দৃষ্টি কেন্দ্রিত রাখব যদি না আমার প্রিয় পাঠকবর্গ আমাকে জানিয়ে দেন যে কোন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার নজর এড়িয়ে গেছে | এছাড়া চলতি কিছু কিছু ঘটনার মূল বহুলাংশে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়ে থাকে। আমি আমার আলোচনায় সেই ঐতিহাসিক সাক্ষরগুলোর  স্বরূপ বোঝার সংক্ষিপ্ত চেষ্টা করব (প্রয়োজনে সেগুলোর পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে) I অনুরূপ ভাবে একাধিক দেশ বা দেশসমূহের পররাষ্ট্র নীতির ভবিষ্যতের গতিপ্রকৃতি সতত নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, অর্থনৈতিক স্থিতি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। সেগুলোর দিকেও নজর রাখব ।

      সংক্ষেপে বলা যায় বিশ্বাঙ্গনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যা ঘটে যায়, তার গতি-প্রকৃতি দ্রুত বহমান ধারার মত, যা অনেক হিসাব ভুল প্রতিপন্ন করে ও বিশেষজ্ঞের ভবিষ্যতবাণী বিফল করে দেয়। কে ভেবেছিলেন রাশিয়া- ইউক্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কয়েক মাস গড়িয়ে চার বছরের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে? এটাই এখন সত্য যে, ভূরাজনৈতিক পূর্বালোকন এখন যতখানি অনুমানভিত্তিক, বোধহয় ততখানি এর আগে কখনই মনে হত না। এর পিছনে একাধিক কার্যকারণ আছে, যা বর্তমানে এই অবস্থার সৃষ্টি করছে, যেমন বিশ্বব্যাপী দূরসঞ্চার ব্যবস্থার অভাবনীয় অগ্রগতি, ভূপৃষ্ঠে দেশগুলির একইভাবে কাছাকাছি চলে আসা ও প্রায় প্রত্যেক দেশের অন্তঃস্থলে জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কিত ভাবনার উন্মেষ হওয়া। পাঠক বন্ধুদের আগ্রহ থাকলে আমি আন্তৰ্জাতিক সম্পর্কের অতিদ্রুত পরিবর্তনশীল দিকটা নিয়ে পৃথকভাবে আলোচন করতে পারি ।

      যাক, এটা দেখা যাচ্ছে ভুগোল ও অর্থনীতি দুটি দেশের বা দুটি দেশসমূহের গোষ্ঠীর পারষ্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ নির্ধারণের লক্ষ্যনীয় প্রভাব বিস্তার করে থাকে। যদিও স্থলভূমিবেষ্টিত দেশগুলি সমূদ্রবন্দরের মাধ্যমে আমদানি ও রপ্তানীর সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ব্যাবস্থা-বিধান বহুদিন থেকে প্রচলিত আছে তবু স্থলভূমিবেষ্টিত    দেশ প্রতিবেশীদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলার পথ বেছে নেয় | কিন্তু ভিনদেশের মধ্যে দিয়ে আমদানী-রপ্তানী চালাবার বিষয়টা সুগম হবে কিনা তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলির পারষ্পরিক সম্পর্কের জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে৷ এ রকম একটা উদাহরণ–যদিও বাংলাদেশ কোন স্থলভূমিবেষ্টিত দেশ নয় গত কয়েক দশক ধরে তার রপ্তানী কৃত দ্রব্যের এক বড় অংশ বিশেষতঃ তৈরি পোষাক- আসাক ভারতের নদী বন্দর কলকাতা দিয়ে পাঠানো হত, যদিও বাংলাদেশের নিজস্ব একাধিক সমুদ্র বন্দর আছে| প্রচলিত দ্বিবিধ পরিবহন ব্যবস্থা অনুযায়ী প্রথমে স্থল পথে রপ্তানী পণ্য দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারতের নদী বন্দরে আনা হত ও ওখান থেকে সমুদ্রপথে বিভিন্ন গন্তব্য পাঠনো হত। এমন কি যখন রপ্তানীকারকদের বিদেশী গ্রাহকের বাঞ্ছিত সময়সীমা রক্ষার চাপ থাকতো তখন তাঁরা তাঁদের পণ্য স্থলপথে হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ভারতের নয়াদিল্লী থেকে বিমানে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার পরবর্তী সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়, তার কারনে সেই সুবিধা হয় ভারতের পক্ষ থেকে সীমিত করা হয়,অথবা বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় বারের মত রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প শাসনভার নেওয়া পর যখন কানাডা ও আমেরিকার মত দুটি বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ছোট পরিসরে অনুরূপ দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যায়। গত চলতি বছরের মে মাসেই কানাডার অন্তর্গত ব্রিটিশ কলম্বিয়ার  প্রাদেশিক বিধানসভা আইন প্রণয়ন করে সরকারে হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, যার বলে প্রাদেশিক সরকার আমেরিকর মূল ভূখন্ড থেকে যে সমস্ত ব্যাবসায়িক বাহন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার মধ্যে দিয়ে আলাস্কা রাজ্যে চলাচল করবে তার ওপর উচ্চহারে টোল ট্যাক্স আদায় করতে পারে। কিন্তু এই আইনে বিবৃত ব্যৱস্থাদি বেশ কিছু ব্যবহারিক কারণে এ পর্যন্ত লাগু করা হয়নি। পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের কাছে ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশ এড়িয়ে কানাডার মধ্যে দিয়ে আলাস্কা পৌঁছানোর একাধিক রাস্তা আছে। ফলতঃ কানডার দক্ষিণ সীমা থেকে বিট্রিশ কলম্বিয়ার মধ্য দিয়ে আলাস্কার রাস্তায় এমনিতেই ব্যানিজিক যানবাহননের ভিড় থাকতো না, যার মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকারের উল্লেখযোগ্য আয় হতে পারে | বৃটিশ কলম্বিয়া ট্রাকারর্স আসেশিয়েসানও এই আইন প্রয়োগ করার বিরোধী ছিল যেহেতু তারা নিজেরাই আমেরিকার রাস্তা ব্যবহার করে মেস্কিকো থেকে দামী কাঠ আনে। তাদের এই সামগ্রী আনা ব্যয়বহুল হয়ে যাবে যদি আমেরিকা (এক বা একাধিক রাজ্য) অনুরূপভাবে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এর থেকে এটাই স্পষ্ট হয় দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্কের সৃষ্টি হলে যুক্তি-তর্ক এবং দেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতি, ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আচ্ছন্ন করতে পারে।

     পক্ষান্তরে কোন দেশের ভৌগলিক অবস্থান ও তার ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সেই সঙ্গে এগুলির মধ্যে কোন বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় হেরফের ঘটলে সেই দেশে আন্তর্জাতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে বড় রকমের প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে সৌদি আরব এক মরুভূমি রাজতান্ত্রিক দেশ ছিল যার আয়ের বড় অংশ পবিত্র মক্কা নগরীতে বছরভর হাজার হাজার তীর্থযাত্রীদের খরচ করা টাকার কিছু অংশ হিসাবে আসতো। এমন কি দেশের রাজধানী রিয়াদ ১৯৩০-এর দশকেও মাটির বাড়ির সমাহারে মধ্যযুগীয় চেহরা বজায় ছিল। কিন্তু সেখানে মাটির নীচে পেট্রোলিয়ামের মত মহামূল্যবান ফসিল  জ্বালানীর আবিষ্কার হওয়ার কারণে সে দেশের অর্থব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছিল যা সেই দেশের কল্পনাতীত ক্রমবর্দ্ধমান সমৃদ্ধির দুয়ার খুলে দিয়েছিল।

     পরিশেষে, এটা অতীতে দেখা গেছে কীভাবে বিশ্বের সার্বভৌম দেশের সর্বশক্তিমন প্রধানদের অদ্ভূত চারিত্রিক বৈশিষ্ট ইতিহাসের গতি পথকে নিয়ন্ত্রিত করেছিল, যেমন নাৎসী জার্মানীর হিটলার এবং ফ্যাসিস্ট ইটালীর মুসোলিনী| দ্বিতীর বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে উগান্ডার ইডি আমিন, লিবিয়ার মুন্মর গদ্দাফি ও ইরাকের সাদ্দাম হুসেনদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক করাল বিধ্বংসী শক্তিস্বরূপ গণ্য করা হয়। আজকের দিনেও এদের মত নর্থ কোরিয়াতে আমরা কুখ্যাত তিন প্রজন্মের একান্তবাসী একনায়ক পরিবারের সাক্ষাৎ পাই,যে দেশ বেপরোয়াভাবে পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে বিশ্বে ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে। ভাবা হয় গণতান্ত্রিক শাসন এই ধ্বংসাত্মক শক্তির বিরুদ্ধে এক ঢাল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে অশ্রু-সাগর, রক্তের বন্যা ও সর্বাত্মক ধ্বংসলীলার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ-প্রদীপ নিভে যাচ্ছে দেখে বিশ্বশান্তি আগের মতই এক মরিচিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে | বিশ্বের প্রায় ২০০ সার্বভৌম দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দক্ষ হাতে পরিচালনা করে জনহিত ও যুদ্ধের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বর্তমান চ্যালেঞ্জকে বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক দুর্দান্ত অগ্রগতি আরও জটিল করে তুলেছে।

      লড়াকু বাদ-বিসংবাদ নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা এই মঞ্চে স্থান পাক, এটাই ঈপ্সিত।



১) প্রতি শুক্রবার ব্লগের নতুন পর্ব (ইংরাজি ভাষায়) প্রকাশিত হবে; ২) এর বাংলা সংস্করণ প্রতি সোমবার প্রকাশিত হবে; ৩ ) অনিবার্য কারণবশতঃ প্রকাশের দিনগুলির হেরফের হতে পারে।

মন্তব্যসমূহ